আপনারা অবগত আছেন, একাত্তরের ঘাতকচক্র ইসলামী ছাত্রসংঘের বিধ্বংসী তাণ্ডবলীলা সম্পর্কে। তখন আমরা হারিয়েছিলাম স্বজন, একজন, দু’জন, শতজন, হাজারজন নয়; আমরা হারিয়েছিলাম ত্রিশ লক্ষ গর্বিত বাঙালিকে, সম্ভ্রম হারিয়েছিলো আমার তিন লক্ষ মা-বোন। নয়টা মাস যে তিন লক্ষ নারী পাকিস্তানি সেনাদের বাঙ্কারে গণ-ধর্ষিতা হয়েছেন, গর্ভাবস্থায়-রজঃস্বলাসহ সব ধরণের অবস্থায় পাকিস্তানিরা যাঁদের এক টুকরো কাপড় পরতে দেয়নি পাছে এই শাড়ি বা ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দেয়, চুল কেটে দেওয়া হতো পাছে চুল জড়িয়ে গলায় ফাঁসি না নেয়...। কতো শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ের পর্যন্ত শেষ আশ্রয় হয়েছে পতিতালয়ে... পাগল হয়ে মরেছেন তাঁরা মধ্যবয়সে। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে ইসলামী ছাত্রসংঘ নাম পরিবর্তন করে ইসলামী ছাত্রশিবির নাম ধারণ করে। ছাত্রশিবির পঁচাত্তর পরবর্তী সময় থেকে বিগত বছরগুলোতে যেই হারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো এই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
জামায়াত-শিবিরের ক্ষেত্রে
সন্ত্রাস রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে এই চক্র ১৯৭১ সালে
মানুষকে হত্যা করেছে, ঘরে আগুন দিয়েছে, মা-বোনের সম্ভ্রম লুটেছে। এখনও হত্যা, রগ কাটা
অব্যাহত রেখেছে। এখনও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তারের জন্য তারা মেধাবী
ছাত্র ও ছাত্রলীগসহ অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাদের হত্যার কর্মসূচি পালন
করে যাচ্ছে। এসব ঘটনা ১৯৭১-এর বুদ্ধিজীবি নিধনেরই ধারাবাহিকতা। মূলত তারা চায় দেশের
শিক্ষাঙ্গনকে অস্থিতিশীল রেখে জাতির বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করতে। শিবিরের নৃশংসতার খতিয়ান
অনেক লম্বা। বিগত কয়েক বছর তাদের হত্যার কর্মসূচি বন্ধ থাকলেও ২০২৪ সালের জুলাই থেকে
তা আবার নতুন মোড়কে শুরু হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা
করে পাক হানাদারদের যারা সহযোগিতা করতো সেই জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠনের
নাম ছিলো ইসলামী ছাত্রসংঘ। ১৯৭৭ সালে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তারা ইসলামী
ছাত্রশিবির নামে আত্মপ্রকাশ করে। বর্বরোচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য সর্বস্তরে
নিন্দিত জামায়াতে ইসলামীর এই ছাত্র সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মাথায় জবাই করে হত্যার
রাজনীতি শুরু করে চট্টগ্রাম থেকে। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে হামলা-সহিংসতা-সংঘর্ষ নতুন
কিছু নয়। তবে এক্ষেত্রে অপরাপর ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে শিবিরের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
শিবির সরাসরি হত্যার মিশনে নামে। তাছাড়া এরা যাকে আঘাত করে তাকে হত্যা করতে না পারলে
চিরতরে পঙ্গু বা অচল করে দেয়। এইজন্য শিবিরের নৃশংসতার সাথে অন্য কারো তুলনা হয় না।
হাতুড়ি, রড, ইট, মুগুর দিয়ে হাড় গুড়ো করে দেওয়া, হাত ও পায়ের রগ কেটে দেওয়া, চোখ উপড়ে
ফেলা, মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা, কব্জি কেটে নেওয়া, কিরিচ, ছোরা, কুড়াল ব্যবহার করে হত্যা
করার মতো নৃশংসতা এদেশের ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে কেবল শিবিরের নামের সাথেই যুক্ত।
তবে ২০২৪ সালে এসে ছাত্রশিবিরের
কর্মতৎপরতা সম্পূর্ণ ভিণ্ন আঙ্গিকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ইমোশনালি ব্যবহার করে
নিজেদের কার্যসিদ্ধি উদ্ধারে তৎপর হয়। তারা কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে গভীরভাবে সংগঠিত
হতে শুরু করে। ডার্কওয়েব ব্যবহার করে সাধারণ ছাত্রদের নাম দিয়ে তাদের কার্যক্রম রাজপথে
নতুন মাত্রা পায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে। ছাত্রশিবিরের আন্ডারকভার এজেন্টরা
স্নাইপারের মাধ্যমে অগণিত ছাত্র-জনতা-শিশুদের হত্যা করে স্বাধীনতাপন্থি বাংলাদেশের
প্রধান দল আওয়ামী লীগকে কক্ষমতাচ্যুত করে মৌলবাদী জঙ্গি শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। ঘৃণিত
জঙ্গি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে পুরো বাংলাদেশকে হত্যার নগরে পরিণত
করে। ছাত্রশিবিরের এসব কর্মকাণ্ড জানতে-বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে পেছনে। আসুন
ইতিহাসের গলি ঘুরে ক্যালেন্ডারের পাতায় দেখে আসি ছাত্রশিবির কর্তৃক সংঘটিত বর্বর হত্যাযজ্ঞের
ইতিহাস।
ক্যালেন্ডারের
পাতায় ইসলামী ছাত্রশিবির কর্তৃক হত্যাযজ্ঞের বিবরণ:
১৯৮০ সালের
২০ সেপ্টেম্বর - চট্টগ্রামে তবারক হত্যাকাণ্ড
প্রতিষ্ঠার মাত্র ৩ বছরের
মাথায় ছাত্রশিবির ক্যাডাররা চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত এজিএস ছাত্রলীগ
নেতা তবারক হোসেনকে কলেজ ক্যাম্পাসেই কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে এবং জবাই করে নৃশংসভাবে হত্যা
করে। কিরিচের এলোপাতাড়ি কোপে গুরুতর আহত তবারক যখন পানি পানি করে কাতরাচ্ছিলো তখন এক
শিবিরকর্মীরা তাঁর মুখে প্রস্রাব করে দেয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়,
চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজ, পলিটেকনিকেল কলেজ ও কঙবাজার সরকারি কলেজে ‘উচ্চারণ’ নামে
ছাত্রশিবিরের একটি সংগঠন ছিলো। এ সংগঠনের কাজ ছিলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে দেয়াল
পত্রিকা প্রকাশ করা। এর মাধ্যমে তারা সদস্য সংগ্রহ করে তাদের নিয়ে বিভিন্ন সভা ও বৈঠক
করতো। মূলত তারা অরাজনৈতিক সংগঠনের পরিচয়ে গোপনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে কোমলমতি
ছাত্রদের সংগঠিত করতো, পরবর্তীতে ‘উচ্চারণ’র চট্টগ্রাম সভাপতি জাহাঙ্গীর কাসেম ৭৭ সালে
প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম কলেজের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলো। অন্যদিকে
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগ সাংগঠনিকভাবে কাজ শুরু করে। তখনকার দিনেও ছাত্রলীগ
চট্টগ্রামে দুই ধারায় বিভক্ত ছিলো। একটি ধারা ছিলো এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর, অন্যটি
আরেক এসএম ইউসুফ-এর।
১৯৮০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর
ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম কলেজের লিচুতলায় সকাল ১০টায় বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা করে। তখন চট্টগ্রাম
কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন চট্টগ্রামের সাবেক সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ
সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বর্তমানে কানাডা প্রবাসী সাহাবুদ্দিন।
মিছিল করে ছাত্র সংসদ অফিসের
দিকে যাওয়ার সময় হোস্টেলের পিছনের দিক থেকে শিবিরের সন্ত্রাসীরা ইট পাটকেল মারা শুরু
করে। তারা কিরিচ, লোহার রড, হকিস্টিক দিয়ে মিছিলের উপর হামলা করে, আধঘণ্টার মতো সংঘর্ষ
চলাকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্র সংসদ অফিসে বঙ্গবন্ধুর ছবি লাগিয়ে অফিস তাদের
দখলে রাখে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের উপর লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশের
হামলায় ছত্রভঙ্গ হয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেব-পাহাড়ের ভেতর আশ্রয় নেন। এর মধ্যে
খবর রটে যায় পুলিশ চট্টগ্রাম কলেজ থেকে একজন ছাত্রের জবাই করা মৃতদেহ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল
কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেছে।
হাজী মহসিন কলেজের ভিপি
ছাত্রলীগ নেতা জামশেদুল আলম চৌধুরী ও ছাত্রলীগ নেতা আলী আব্বাস দেবপাহাড় পার হয়ে মেডিক্যালে
এসে দেখেন জরুরি বিভাগের সামনে এস্ট্রেচারে কাপড় দিয়ে ঢাকা একটি মৃতদেহ, পায়ে কেডস
পরা। তারা লাশের মুখের কাপড় সরিয়ে দেখেন তবারক। সাথে সাথে পুরো চট্টগ্রামের মধ্যে তবারক
হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মেডিক্যালে এসে তবারকের লাশ কাঁধে নিয়ে
মিছিল বের করলে পুলিশ লাশ ছিনিয়ে নেয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল সহকারে জামাল খান
প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করে, ওই সমাবেশ থেকেই তবারক হত্যার প্রতিবাদে পরের
দিন চট্টগ্রামে অর্ধদিবস হরতাল ঘোষণা করে। ইতোমধ্যে পুলিশ তবারকের লাশ পোস্টমর্টেম
করে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলে সন্ধ্যায় বাকলিয়া ও সিটি কলেজে দু’দফা জানাজা
শেষে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে গরিবুল্লাশাহ মাজার সংলগ্ন কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তার পরের দিন হরতাল চলাকালীন
নিউ মার্কেটের মোড়ে প্রতিবাদ সভায় পুলিশ টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে। পুলিশের
হামলায় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা এম এন ইসলাম, খালিকুজ্জামান, সফর আলী, বশির উদ্দিন মাহমুদ,
রাশেদ মনোয়ার, জামশেদুল আলম চৌধুরী ও মিরেরশরাইয়ের মোস্তফাসহ ২০-৩০ জন আহত হই। ছাত্রলীগ
কেন্দ্রীয় কমিটি তবারক হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘটের
ডাক দেয়। লালদিঘির ময়দানে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে ছাত্রলীগের সভাপতি ওবায়দুল কাদের
ও সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনুন চুন্নু জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন
গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। মূলত শহীদ তবারকের রক্তস্নাত পথ বেয়ে চট্টগ্রামসহ সারা বাংলাদেশের
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তবারক হত্যার প্রতিশোধ স্পৃহাই অমিত তেজ আর সাহস নিয়ে ছাত্রলীগের
সাংগঠনিক ভিত্তিকে মজবুত করে ছিলো, যার ফলে তার পরের বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে
ছাত্রলীগ সারা বাংলাদেশে জয়লাভ করেছিলো।
১৯৮২ সালের
১১ মার্চ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের নারকীয় তাণ্ডব
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ৩টি
যাত্রীবাহী বাস ভর্তি করে বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে শিবির ক্যাডাররা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এই সহিংস ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবির ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে
যাবার পর ছাত্রলীগ ও ছাত্র মৈত্রী খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করলে শিবিরের কয়েকজন সন্ত্রাসী
প্রশাসন ভবনের সামনে অকষ্মাৎ ছাত্রলীগের মিছিলে হামলা করে রাকসু জিএস খন্দকার জাহাঙ্গীর
কবির রানা, ছাত্রলীগ সভাপতি বজলার রহমান ছানা (প্রয়াত বিচারপতি), ছাত্রলীগ নেতা আমিরুল
আলম মিলনকে মারপিট করে গুরুতর জখম করে। খবর পেয়ে হবিবুর রহমান হল ছাত্র সংসদের ভিপি
লিয়াকত আলী তালুকদার, লাল পান্না (জয়পুর হাট), আইন বিভাগের ছাত্র রবিউল আলম বুদু (বর্তমান
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি) ও ছাত্রলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন সাখোসহ আরো কয়েকজন দ্রুত
এসে তাদেরকে উদ্ধার করে এসএম হলে সাখোর রুমে নিয়ে যায়। তারপর শুরু হয় পুলিশি অ্যাকশন।
যে যার মত ক্যাম্পাস থেকে সরে যায়। পরের দিন ১২ মার্চ লিয়াকত আলী তালুকদার, লাল পান্না,
রবিউল আলম বুদু ও সাখোসহ ৮/১০ জন ছাত্রনেতা সকাল ১০ টার দিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক
শামসুজ্জোহার কবরের পাশে সমবেত হয়ে প্রশাসন ভবনের পশ্চিম মাঠে (যেখানে আগের দিন ১১
মার্চ শিবির সমবেত হয়েছিলো) প্রায় শূন্য ক্যাম্পাসে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সভায় সাখাওয়াত
হোসেন সাখো তার বক্তব্যে, ক্যাম্পাসে শিবির তথা সাম্প্রদায়িক শক্তির রাজনীতি নিষিদ্ধ
ঘোষণা করে। তারপর কমপক্ষে ১০ বছর তা বলবৎ ছিলো।
এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে
নিজেদের বলয় বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে বিয়ের সম্পর্ক স্থাপন করতে শুরু করে ছাত্রশিবির।
সাংগঠনিক নির্দেশে তারা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আশপাশে পরবর্তী কয়েক বছরে নিজেদের শক্ত
বলয় তৈরি করে। নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৮৪ সালের
২৮ মে, চট্টগ্রাম কলেজ - ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শাহাদাত হত্যাকাণ্ড
চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে
সামপ্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয় ছাত্র ইউনিয়ন নেতা
ও মেধাবী ছাত্র শাহাদাত হোসেনকে। তিনি পড়তেন চট্টগ্রাম কলেজে, থাকতেন সোহরাওয়ার্দী
হলের ১৫ নম্বর কক্ষে। হল কমিটির কোষাধাক্ষ ছিলেন শাহাদাৎ। ১৯৮৪ সালের ২৮ মে নিজ কক্ষে
তাকে জবাই করে হত্যা করে ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা। শাহাদাত হোসেনকে ঘুমের মধ্যে জবাই
হত্যা করে। শাহাদাত হোসেন সে রাতে তার উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবহারিক পরীক্ষার প্রস্তুতি
নিয়ে ঘুমোতে যান। ঘুমের মধ্যেই ছাত্রশিবির সদস্য হারুণ ও ইউসুফ গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই
করে হত্যা করে শাহাদাতকে। শাহাদাতের অপরাধ ছিলো সে হারুণ ও ইফসুফের কথায় ছাত্রশিবিরে
যোগ দেয়নি! পরবর্তীতে শাহাদাত হত্যাকাণ্ডের জন্য এই দুজনের সাজা হয়। কিন্তু দু’বছর
পরই উচ্চ আদালতের রায়ে দুজনেই শাহাদাত হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় জামিনে জেল
থেকে বের হয়ে আসে। পরবর্তীতে এই মামলা থেকে হারুণ ও ইউসুফ বেকসুর খালাস পেয়ে যায়!
মৃত্যুর পরের দিন ছিলো
শাহাদাতের উচ্চ মাধ্যমিক ব্যবহারিক পরীক্ষার শেষ দিন। শহীদ শাহাদাতের স্বপ্ন ছিলো শোষণহীন,
অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার। ঘাতকচক্র চেয়েছিলো। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে
তার স্বপ্নকে ভেঙে দিতে। বিস্তৃত স্বপ্নের বল্গাহীনতায় ভীত হয়ে তারা রাতের অন্ধকারে
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। ঘাতকেরা বরাবরের মত চোখে ঠুলি পরে ভুলে যেতে চেয়েছিলো যে,
শাহাদাত মৃত্যুবরণ করলেও তার স্বপ্ন ও আদর্শ মৃত্যুবরণ করবে না। শাহাদাত শাহাদাত ছোটবেলা
থেকেই বিনয়ী ও মেধাবী ছাত্র ছিলেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ভালো ছবি আঁকতেন। তার শখের
মধ্যে ছিলো বই পড়া, স্ট্যাম্প সংগ্রহ আর কবিতা আবৃত্তি করা।
১৯৮০ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ের
আলরাউন্ড বেস্ট পুরষ্কার পেয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রের গৌরব অর্জন করেন। প্রতিবছর
স্কুলের বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রায় পুরস্কার শাহাদাতের বাসায় জমা হতো।
তিনি গান, কবিতা, ছবি আঁকাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২
সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে (১ম বিভাগে ৫টি লেটার মার্ক) উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম
সরকারি কলেজে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম কলেজ ইসলামী ছাত্র শিবিরের দখলে থাকা সত্ত্বেও শাহাদাত
কলেজ জীবনেই বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন। তিনি কলেজের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাস
শাখার কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।
১৯৮৬ সালের
২৬ নভেম্বর: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রনেতা আবদুল হামিদের কব্জি কর্তন
ছাত্রশিবির কর্মীরা ডান
হাতের কবজি কেটে নেয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আবদুল হামিদের। পরবর্তীতে
ওই কর্তিত হাত বর্ষার ফলায় গেঁথে তারা উল্লাস প্রকাশ করে। সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ
ক্ষমতায়। তখন জাতীয় ছাত্র সমাজের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন আবদুল
হামিদ। আগের দিন ঢাকায় এইচ এম এরশাদ ও মওদুদ আহমদের উপস্থিতিতে সভা করে ক্যাম্পাসে
ফেরেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের স্নাতকোত্তর বিভাগের শিক্ষার্থী
হিসেবে থাকতেন আলাওল হলে। শিবিরের ক্যাডাররা তার ডান হাতের কব্জি কেটে নেয়, গুলিও করে।
শিবির ক্যাডারদের ওই হিংস্রতার
ঘটনা স্মরণ করে হামিদ বলেন, ১৯৮৬ সালের ২৬ নভেম্বর দুপুরে শাহজালাল হলের সামনে আরও
একজনসহ খাবার খেতে যান। ওইখানে আগে থেকেই অবস্থানরত ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মী
তার সঙ্গে কথা বলে ভাত খেতে চান। তিনি সরল মনেই তাদের নিয়ে ভাত খেতে বসেন এবং নিজেই
বিল দেন।
আবদুল হামিদ বলেন, “ওই
সময়ে চাকসু নির্বাচনের জন্য শিবিরবিরোধী প্যানেল দিতে ছাত্রসমাজসহ ১৩টি সংগঠনের মতৈক্য
হয়। সে কারণে শিবিরের ছেলেরা আমার ওপর খ্যাপা ছিলো। ভাত খেয়ে আলাউল হলের দিকে রিকশায়
করে যাচ্ছিলাম। যাদের আমি ভাত খাওয়ালাম, ওরাই দেখি আমার ওপর হামলা করেছে। প্রথমে গুলি
করলে সেটা মুখে লাগে। এরপরও কিছু না হওয়ায় তারা মাটিতে ফেলে কুপিয়ে আহত করে ডান হাতের
কব্জি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। তারা মনে করেছিল আমি মরে গেছি। সে কারণে
ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলো। পরে লোকজন তুলে হাটহাজারী থানায় নিয়ে গেলে অ্যাম্বুল্যান্সে
করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকার
পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ১২ দিন পর হাতের অপারেশন করা হয়। আমার জীবন শেষ করে দিতে
চেয়েছিলো। পঙ্গু অবস্থায় কোনো রকমে বেঁচে আছি। ওই ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠি।”
১৯৮৭ সালের
২৯ জানুয়ারি: চট্টগ্রামের ডবলমুরিং - দেবপ্রিয় বড়ুয়া অয়নের পায়ের রগ কর্তন
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে
সরকারি কমার্স কলেজে সন্ত্রাসবিরোধী দেওয়াল লিখন করতে গিয়ে ছাত্রশিবিরের হামলার শিকার
হন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা দেবপ্রিয় বড়ুয়া অয়ন। শিবিরের ক্যাডাররা তাকে কোপানোর
পর দুই পায়ের গোড়ার রগ কেটে দেয়, ভেঙে দেয় দুই হাত। সাড়ে তিন মাস দেশে চিকিৎসার পর
উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়াতেও পাঠানো হয়।
ছাত্রশিবিরের হামলার ক্ষত
দেবপ্রিয় বড়ুয়া এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। বাম পা এখনো তাকে দেবে চলতে হয়। ওই সময় তিনি ছিলেন
ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা কমিটির সভাপতি। আগ্রাবাদের কমার্স কলেজের
দেয়ালে ওইদিন রাতে ‘অস্ত্র নয় বই চাই, সন্ত্রাস নয় শান্তি চাই’ এই স্লোগান লিখছিলেন।
দেবপ্রিয় স্মৃতি হাতড়ে
বলেন, “লেখার সময় শিবিরের ক্যাডাররা হঠাৎ আক্রমণ করে। তখন সঙ্গে থাকা অন্যরা পালাতে
পারলেও আমি আটকা পড়ি। আমাকে তারা ছুরি, হকিস্টিক ও লোহা দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে মৃত ভেবে
ফেলে রেখে চলে যায়। পথের এক ব্যবসায়ী ট্যাক্সি করে আমাকে হাসপাতাল পৌঁছে দিয়েছিলো।
ছাত্রশিবিরের ছেলেরা আমার দুই পায়ের রগ কেটে দেয়, দুই হাত ভেঙে দেয়। প্রচুর রক্তক্ষরণ
হয়েছিলো তিন মাস হাসপাতালে থেকেও পুরোপুরি ভালো হতে পারিনি। ডান হাতে লিখতে পারতাম
না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাম হাতে লেখা প্র্যাক্টিস করেছি। পরে পার্টির (সিপিবি)
পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিলো।”
বর্তমানে চট্টগ্রামের বেসরকারি
একটি কলেজের উপাধক্ষ্য দেবপ্রিয় বড়ুয়া বলেন, “আমি এখনো দুই পায়ের জোরে দাঁড়াতে পারি
না। ওই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। কিন্তু আদর্শ থেকে সরিনি।
১৯৮৮ সালের
৩১ মে : রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ - ছাত্রমৈত্রী নেতা ডা. জামিল আকতার রতন হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ প্রধান
ছাত্রাবাসের সামনে কলেজের প্রিন্সিপাল ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ ও শত শত শিক্ষার্থীদের
সামনে ছাত্রমৈত্রীর নেতা ডাক্তার জামিল আকতার রতনকে কুপিয়ে হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা
করে শিবিরের ক্যাডাররা, এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে আহত হয় অসংখ্য ছাত্রলীগ ও ছাত্রমৈত্রীর
কর্মীরা। সাল ১৯৮৮, তারিখ ৩১ মে। দল-মত নির্বিশেষে অনেকের কাছেই এক দুর্বহ স্মৃতির
একটা দিন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি জামিল আকতার রতনকে প্রকাশ্যে
দিনের আলোতে শিক্ষকদের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা।
নব্বইয়ের দশকে রাজশাহী
মেডিকেল কলেজ হয়ে উঠেছিলো সে সময়ের প্রগতিশীলতার প্রতীক, ছোটখাটো গড়নের এক দুর্দান্ত
মেধাবী ছাত্রনেতা জামিল আকতার ছিলেন যার মধ্যমণি। আজন্ম বিপ্লবী জামিলের চোখে মুখে
ছিল এক গভীর স্বপ্ন, শ্রেণীহীন, শোষণহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হতো
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের প্রগতিশীল আন্দোলন আর চিন্তার চর্চা। হয়তো সেকারণেই এই তীব্র
আঘাতের টার্গেট করা হয় জামিল আকতার রতনকে।
৩০ মে, রাত। ঘটনার সূত্রপাত
হয় সে রাতেই। শিবির মিছিল করছে। এমন সময় অন্ধকার থেকে কে বা কারা আওয়াজ তোলে “ধর-ধর”।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজে কোনও সংগঠন মিছিল করলে কেউ “ধর-ধর” করবে এমন সংস্কৃতি কখনও ছিলো
না। সে সময় রাজশাহী মেডিকেলে শিবির সমর্থন করতো সব মিলিয়ে বড়জোর ৩০-৪০ জন ছাত্র। এই
“ধর-ধর” শব্দের পরেই শিবিরের সেই মিছিলে এসে জুটলো ছাত্রশিবিরের শতাধিক বহিরাগত সন্ত্রাসী,
সবার হাতেই অস্ত্র। সেই অস্ত্র নিয়ে তারা সারারাত চালালো মধ্যযুগীয় মহড়া।
সকাল হতেই ছাত্র সংগ্রাম
পরিষদ মিছিল নিয়ে অধ্যক্ষের কাছে স্মারকলিপি দিলো এবং অভিযোগ করলো, মেইন হোস্টেলের
কলাপসিবল গেট বন্ধ করে অস্ত্রসহ শিবিরের অনেক বহিরাগত অবস্থান করছে। ততক্ষণে একাডেমিক
কাউন্সিল এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে করণীয় কি, তার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নিয়ে মিটিংয়ে
বসে গেছেন। ছাত্রদের অভিযোগ শুনে একাডেমিক কাউন্সিল সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা
যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই মিটিং থেকেই অধ্যক্ষসহ প্রায় তিরিশ জন শিক্ষকের একটি
দল মেইন হোস্টেলে যান। কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে জামিল আকতার রতনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষকরা যখন মেইন হোস্টেলে ঢুকতে যান, তখনই বাধা আসে সেখানে অবস্থানরত শিবিরের ক্যাডারদের
কাছে থেকে। এর মধ্য থেকে কয়েকজন বহিরাগত শিক্ষকদের সাথে উদ্ধতভাবে তর্কে জড়িয়ে পড়ে।
জামিল আকতার রতন সেই বহিরাগতদের দেখিয়ে বলেন, “এই দেখুন স্যার, বাইরের লোক।” এর মধ্যেই
হঠাৎ এক অপার্থিব তীব্র হুইসেলের শব্দ আর “নারায়ে তাকবীর” বলে ছাত্রশিবিরের শতাধিক
অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী শিক্ষকদের সামনেই কাপুরুষের মতো নিরস্ত্র জামিল আকতার রতনকে ধাওয়া
করে। এর পরের অংশ শুনুন একাডেমিক কাউন্সিলের বিবৃতি থেকে:
“জামিল হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলর আজ এক বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, প্রকৃত
ঘটনা হচ্ছে গত ৩১ শে মে বেলা আনুমানিক ১১টায় কলেজের সাধারণ ছাত্ররা মিছিল সহকারে একাডেমিক
কাউন্সিলের সভায় এসে অভিযোগ করে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছত্রছায়ায় একদল বহিরাগত অস্ত্রশস্ত্রসহ
প্রধাণ ছাত্রাবাসের পশ্চিম উত্তর ব্লকে অবস্থান করছে এবং কলেজে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম
করেছে। তখন একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাউন্সিলের সদস্য ও অন্যান্য শিক্ষক
অবস্থা দেখার জন্য ছাত্রাবাসে যান। ছাত্রাবাসের দুটি ব্লক দেখে পশ্চিম-উত্তর ব্লকে
যাবার সময় কিছু ছাত্র তাদের বাঁধা দেয়। এদেরকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ও সমর্থক
বলে চিহ্নিত করা হয়। যারা বাঁধা দেয় তারা দাবী করে যে, তাদের প্রত্যেকের ৫জন করে অতিথী
আছে এবং কোনমতেই ওই ব্লক পরিদর্শন করা যাবে না। এর পরেও সেদিকে যাবার সময় তারা বাঁশি
বাজিয়ে ‘নারায়ে তকবির’ স্লোগানসহ মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে এসে নীচে দণ্ডায়মান
সাধারণ ছাত্রদের ধাওয়া করে। ওই অবস্থায় জামিল আখতার রতন নামে ৫ম বর্ষের একজন ছাত্রকে
মারাত্মকভাবে আহত করে। তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার পর সে মারা যায়। উল্লেখ্য, ছাত্রাবাস
থেকে আসার সময় ওই উচ্ছৃঙ্খল হাঙ্গামাকারিরা আবার বাঁধা দেয়। এ সময় গাড়ি ভাংচুর এবং
বোমা নিক্ষেপ করা হয়।”
১৯৮৮ সালের
১৭ জুলাই : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - প্রগতিশীল ছাত্রনেতাদের পায়ের রগ কর্তন
ভোর সাড়ে চারটার দিকে রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ্ মাখদুম হলে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা হামলা চালায় এবং জাসদ ছাত্রলীগের
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ূব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয়
শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের
হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। এই ঘটনায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে আহত হয় ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতাকর্মী।
উত্তাল হয়ে হয়ে রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো সকলে মিলে সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে
তোলে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে। পুনরায় ছাত্রদের সন্ত্রাসবিরোধী মিছিলে হামলা চালায় ছাত্রশিবির।
আহত হয় অসংখ্য ছাত্রছাত্রী। তখন ছাত্রশিবিরের লাগাতার সন্ত্রাসে আতংকিত হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বল নিরাপত্তা বলয়ের কারণে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে বিশ^বিদ্যালয়।
হল খালি করে বিশ^বিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।
১৯৮৮ সালের
২৪ সেপ্টেম্বর : সিলেট মহানগর - ছাত্রনেতা মুনির-তপন-জুয়েল হত্যাকাণ্ড
সিলেটের তৎকালীন ছাত্র
সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও জাসদ ছাত্রলীগের মুনির ই কিবরিয়া, তপন জ্যোতি দেব এবং এনামুল
হক জুয়েলকে নির্মমভাবে হত্যা করে ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা। ছাত্রশিবিরকে প্রতিরোধ
করার জন্য প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে সিলেটে গঠন করা হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম
পরিষদ। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তখন ছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ,
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রলীগ। মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যা
মামলার বাদী জাসদ নেতা ছদরউদ্দিন আহমদ বলেন, “মামলা করেছিলাম ন্যায়বিচার পেতে। কিন্তু
মামলা চলাকালে অনেকের কাছ থেকে সহযোগিতা পাইনি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের আদালতে
নিয়ে আসতে পারিনি। এজন্য আলোচিত এই হত্যা মামলা থেকে সকল আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।”
তৎকালীন রাজনীতির মাঠে
সক্রিয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট পলিটেকনিক
ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে সিলেটের ছাত্র রাজনীতি। বিপুল
অর্থ ব্যয় করে ছাত্রশিবির পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিজেদের প্যানেলের
পক্ষে প্রচারণার মাধ্যমে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করে। নির্বাচন নিয়ে যখন দক্ষিণ সুরমায়
উত্তেজনা বিরাজ করছে, সেই সময়ে এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কর্মীদের ওপর হামলা চালায় শিবির।
তারা সিলেটে সশস্ত্র মিছিল বের করে। সেপ্টেম্বরের ১৯ ও ২০ তারিখেও শিবির এমসি কলেজে
সশস্ত্র অবস্থান নেয় এবং ছাত্রলীগকে তারা কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেয়নি। ২০ সেপ্টেম্বর
ছিলো সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদের নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের
ব্যাপক ভরাডুবি হয় এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছাত্র সংসদের ১৫টি পদের সবগুলোতে
জয়লাভ করে।
১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর
ভোরে ছাত্রশিবিরকর্মীরা এমসি কলেজ ক্যাম্পাস দখল করে নেয়। এছাড়া সিলেট আলিয়া মাদ্রাসাকে
নিজেদের হেডকোয়ার্টার বানিয়ে ছাত্রশিবির নগরীর বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি, মোটরসাইকেল ও টেম্পোযোগে
সশস্ত্র মহড়া দিতে শুরু করে। ছাত্রশিবিরের এই আকস্মিক ক্যাম্পাস দখলের ফলে প্রগতিশীল
ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছিলো না। তারা কলেজের আশপাশে
অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলো। তখন আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টেম্পোযোগে একদল
সশস্ত্র কর্মী নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় জড়ো হওয়া জাসদ ছাত্রলীগের কর্মীদের ওপর চারপাশ
থেকে সশস্ত্র হামলা চালায়। মুনিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে কোপাতে তারা রাস্তার
পাশে ফেলে রাখে। পাথর দিয়ে তপনের শরীর থেঁতলে দেয়। একই সময়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের
নেতারা এমসি কলেজে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। শিবিরের
নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে আম্বরখানায় স্কুলছাত্র এনামুল হক জুয়েলকে ধাওয়া
করা হয়। জুয়েলের জন্য শিবির স্কুলগুলোতে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারছিলো না বলে তার
ওপর তাদের ক্ষোভ ছিলো। অস্ত্রধারী শিবির ক্যাডারদের ধাওয়া খেয়ে জুয়েল তখন দৌঁড়ে একটা
মার্কেটের ছাদে উঠে যায়। অস্ত্র নিয়ে তার পেছনে পেছনে ধাওয়া করতে থাকে ছাত্রশিবিরের
সন্ত্রাসীরা। শিবিরের ধাওয়া খেয়ে নিরুপায় জুয়েল কোনও রাস্তা না পেয়ে মার্কেটের এক ছাদ
থেকে পার্শ্ববর্তী ছাদে লাফ দিতে গিয়ে নিচে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের
পর জাসদ নেতা ছদরউদ্দিন আহমদ বাদী হয়ে মুনির,
তপন, জুয়েল হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন ছাত্রশিবিরের নেতা জিয়াউদ্দিন
নাদের, সায়েফ আহমদ, সোহেল আহমদ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম, আবদুল করিম জলিল এবং অজ্ঞাত বেশ
কয়েকজনের নামে মামলা করেন। মুনির ও তপন হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন শামীম সিদ্দিকী,
কামকামুর রাজ্জাক রুনু ও বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী। মামলা চলাকালীন তারা কেউই আসামিদের বিরুদ্ধে
আদালতে এসে সাক্ষী দেননি। যার কারণে তারা মামলা থেকে অব্যাহতি পান। অভিযোগ আছে, এই
মামলায় কামকামুর রাজ্জাক রুনুর সাক্ষ্য না দেওয়ার কারণ হলো মামলার অন্যতম আসামি সোহেল
আহমদ চৌধুরী তার আত্মীয় ছিলো। মামলার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বিষ্ণুপদ চক্রবর্ত্তী
মামলা চলাকালীন সিলেট ছেড়ে চলে যান এবং মামলা শেষ হওয়ার আগে আর সিলেটে আসেননি। সাক্ষ্য-প্রমাণ
না থাকায় মামলার আসামিরা সবাই বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। তাই আজও মুনির-তপন-জুয়েলের হত্যাকারীরা
থেকে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
১৯৮৯ সালের
নভেম্বর: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - জাসদ ছাত্রলীগের ওপর হামলা নিহত ২
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে সন্ধ্যায় জাসদ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ওপর শিবিরের
বোমা হামলায় দুইজন নিহত এবং ছাত্রনেতা বাবু, রফিকসহ ১০ জন আহত হয়।
১৯৯০ সালের
২২ ডিসেম্বর: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রমৈত্রী নেতা ফারুকুজ্জামান হত্যাকাণ্ড
ছাত্রমৈত্রীর চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-সভাপতি ফারুকুজ্জামান ফারুককে শিবিরের ক্যাডাররা জবাই করে হত্যা
করে তাঁর খণ্ডিত মাথা প্রকাশ্য রাস্তায় দুই ঘন্টা রেখে দেয়। ছাত্রশিবির ততদিনে বিভিন্ন
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘাপটি মেরে ঢুকে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওড় অঞ্চল থেকে
উঠে আসা তরুণ ফারুকুজ্জামান ছিলেন ছাত্র মৈত্রীর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি।
১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
সম্মিলিত উদ্যোগে স্বৈরাচার পতনের আনন্দে বিজয় মিছিল বের হলো ঠিক তখন সেই মিছিলে হামলে
পড়লো ঘাপটি মেরে থাকা সেই খুনি ছাত্রশিবির। মিছিলে অংশগ্রহণকারী শিক্ষিকাদের শারিরিকভাবে
লাঞ্চিত হতে দেখে ছাত্রমৈত্রীর তরুণ যোদ্ধা ফারুকুজ্জামান সেই শিক্ষিকাদের রক্ষা করতে
খালি হাতেই রুখে দাঁড়ায় সন্ত্রাসী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে। ছাত্রশিবিরের ছোরা গুলি ও
ধারালো অস্ত্রের বর্বরতায় মারাত্মকভাবে আহত হন ফারুক।
২৪ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন
অবস্থায় ফারুকুজ্জামান নিজের জীবন উৎসর্গ করে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে
লড়াইকে প্রেরণা দিয়ে গেছেন।
১৯৯২ সালের
১৭ মার্চ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত পিটু হত্যাকাণ্ড:
পবিত্র রমজান মাসে চট্টগ্রাম
কলেজের ছাত্রশিবির সভাপতি সৈয়দ জাকিরের (বর্তমানে এ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স-এর প্রকাশক)
নিয়ন্ত্রণাধীন কুখ্যাত সিরাজুস সালেহীন বাহিনীসহ কয়েক হাজার সশস্ত্র বহিরাগত ছাত্রশিবির
সন্ত্রাসী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বেলা ১১ টার সময় অতর্কিত হামলা চালালে
ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত পিটু নিহত হয় এবং ছাত্রলীগের আইভি, নির্মল, লেমন, রুশো,
জাফু, ফারুক এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের রাজেশসহ প্রায় দেড় শাতাধিক ছাত্র-ছাত্রী
আহত হয়। এদের অধিকাংশেরই হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয় এবং রাজেশের কব্জি কেটে ফেলা হয়।
এই হামলার সময় শিবির ক্যাডাররা শাহ্ মাখদুম হল, আনোয়ার হল এবং লতিফ হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে
দেয়। ব্যাপক আকারে গান পাউডারের ব্যবহার করায় হলের জানালার কাঁচগুলো গলে গিয়েছিলো।
লতিফ হলের অনেকগুলো কক্ষ এখনো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এই হামলার তীব্রতা এতটাই ছিলো
যে, বেলা ১১টায় শুরু হওয়া হামলা রাত ৩টায় বিডিআর নামানোর আগ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি।
১৯৯২ সালের
১৯ জুন: রাজশাহী মহানগর - ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নেতা মুকিম হত্যা:
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের
নেতৃত্বে দেশের প্রধান যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের হরতাল
কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে মিছিল চলাকালে শিবিরের সশস্ত্র হামলায় রাজশাহীর সাহেব বাজার
জিরো পয়েন্টে ওই আন্দোলনের অন্যতম নেতা মুকিম মারাত্মকভাবে আহত হয়, পরে চিকিৎসাধীন
অবস্থায় ২৪ জুন তিনি মারা যান।
১৯৯২ সালের
আগস্ট: রাজশাহীর বুথপাড়া - শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়িতে বোমার কারখানা : নিহত
আজিবর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
পাশ্ববর্তী নতুন বুথপাড়ায় শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়িতে বোমা বানানোর সময় শিবির
ক্যাডার আজিবরসহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিনজন নিহত হয়। বিষ্ফোরণে পুরো ঘর মাটির সাথে
মিশে যায় এবং টিনের চাল কয়েক’শ গজ দুরে গাছের ডালে ঝুলতে দেখা যায়। পরবর্তীতে পুলিশ
মহল্লার একটি ডোবা থেকে অনেকগুলো খণ্ডিত হাত পা উদ্ধার করে। যদিও শিবির সাংগঠনিকভাবে
আজিবর ছাড়া আর কারো মৃত্যুর কথা স্বীকার করেনি। পুলিশ বাদী হয়ে মতিহার থানায় শিবির
ক্যাডার মোজাম্মেলকে প্রধান আসামী করে বিষ্ফোরক ও হত্যা মামলা দায়ের করে। প্রায় ৫ বছর
পলাতক থাকার পর মামলা ম্যানেজ করে মোজাম্মেল এলাকায় ফিরে আসে এবং জামায়াতের রাজনীতিতে
পুনরায় সক্রিয় হয়ে খুনের রাজনীতিতে ফিরে আসে।
১৯৯৩ সালের
৬ ফেব্রুয়ারি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্র ইউনিয়নের তপন, ছাত্রদলের নতুন ও বিশ্বজিৎ
হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিবির সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালালে ছাত্রলীগ ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম
পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হামলায় ছাত্র ইউনিয়নের তপন, ছাত্রদলের
নতুন ও বিশ্বজিৎ নিহত হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে জামায়াত দলটিকে সমর্থন দেয়। জামায়াতের সমর্থন নিয়ে
সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে ছাত্রশিবির।
হাত ও পায়ের রগ কেটে মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর অসংখ্য
নেতাকর্মীকে। এমনকি তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও
ছাত্রশিবির ক্যাডারদের নৃশংসতা থেকে রক্ষা পাননি।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২
সালের শেষ দিক থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে এবং ক্যাম্পাসে আগ্রাসী হয়ে
ওঠে শিবিরের আচরণ। প্রতিটি হলের গেটে অবস্থান নেয়া, বিরোধী মতামতের অন্যান্য সংগঠনের
নেতাকর্মীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতন এবং গান পাউডার দিয়ে আবাসিক
হলগুলোর ক্ষতিসাধন করতে থাকে নরপশুরা। এ ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির মুখে ক্যাম্পাসে সক্রিয়
অন্যসব ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণে গড়ে তোলা হয় শিবিরবিরোধী সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য।
১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রশিবির।
সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য প্রতিরোধ করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এ সময় ছাত্রশিবির ক্যাডারদের
চরম নৃশংসতায় নিহত হন ছাত্র ইউনিয়নের তপন, ছাত্রদলের নতুন ও বিশ্বজিৎ।
সাবেক ছাত্রনেতাদের সঙ্গে
কথা বলে জানা গেছে, মূলত ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ এবং ৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রশিবিরের
পরিকল্পিত সন্ত্রাস বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রেখেছে।
ওদের অত্যাচারে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে থাকেন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর
মধ্য দিয়েই ক্যাম্পাসে তাদের দখলদারিত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ ততোদিনে প্রগতিশীল
সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ছাড়া।
১৯৯৩ সালের
১৯ সেপ্টেম্বর: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রমৈত্রী নেতা জুবায়ের চৌধুরী রীমু হত্যাকাণ্ড
বহিরাগত সশস্ত্র ছাত্রশিবির
কর্মীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয়
টিমের মেধাবী ক্রিকেটার জুবায়ের চৌধুরী রীমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে
হত্যা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। একটি স্বপ্ন, একটি
সম্ভাবনা সেদিন খুন হয়েছিলো স্বাধীনতাবিরোধী অপচক্রের হাতে।
জুবায়ের চৌধুরী রীমু রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। ছিলেন ওই ক্যাম্পাসে জামাত-শিবির-সাম্প্রদায়িক
চক্রের বিরুদ্ধে বজ্রসম কণ্ঠ। জামাত-শিবিরবিরোধী আন্দোলনে রীমু’র ভূমিকার কারণেই তিনি
ওদের প্রধানতম শত্রুদের একজনে পরিণত হন। ফল হিসেবে সেদিনের সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটায়
ওরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী ছিলো এই জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রতিরোধী শক্তি। ১৯৯৩
সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী
ও ছাত্রদলের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। ওইদিনই রাতের বেলা আবাসিক হলগুলোর শিক্ষার্থীরা যখন
পড়াশুনা কিংবা ঘুম কিংবা টেলিভিশন দেখায় মত্ত, তখন পূর্বপরিকল্পিতভাবে শেরেবাংলা হলে
আক্রমণ করে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। রীমু’র সেদিন পালিয়ে আত্মরক্ষার সুযোগ
ছিলো। কিন্তু রীমু হল অরক্ষিত রেখে নিজে বাঁচতে চাননি। ছাত্রশিবিরের প্রশিক্ষিত ঘাতকরা
তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছে, হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করেছে।
জুবায়ের চৌধুরী রীমু’র
এই আত্মদান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে এক যুগান্তকারী ইতিহাস হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত হয়। রীমু’র রক্তের বদলা নেওয়ার শপথ নিয়ে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সকল
ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তি সেদিন আন্দোলনের নতুন
দিশা পায়।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম
তখন একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনে সোচ্চার। তিনি তখন বাংলাদেশের
সকল শহীদ সন্তানের জননী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। রীমু’র মায়ের পুত্রশোক ছুঁয়ে গেলো তাঁকেও।
জাহানারা ইমাম সেদিন রীমু’র মা জেলেনা চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন একই শোকগাঁথা বুকে
নিয়ে। রীমু’র হত্যাকারী ছাত্রশিবির ক্যাডারদের বিচারের দাবিতে তিনিও সোচ্চার হয়েছিলেন।
রীমু’র মাকে নিজ হাতে লেখা শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও। বরেণ্য
কবি ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রামের আরেক অভিভাবক শামসুর রাহমান কবিতা লিখেছিলেন
রীমু’র আত্মদানকে উপজীব্য করে। কবিতা লিখেছিলেন আসাদ চৌধুরীও।
১৯৯৫ সালের
১৩ ফেব্রুয়ারি: রাজশাহী মহানগর - ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টচার্য রূপম হত্যাকাণ্ড
ছাত্রশিবির কর্মীরা রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সকাল-সন্ধ্যা
বাসে হামলা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রীর নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে বাসের মধ্যে যাত্রীদের
সামনে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার আগে বর্বর শিবির ক্যাডাররা তাঁর হাত ও পায়ের রগ কেটে
নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট
অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর স্টাডি অব টেরোরিজমের প্রতিবেদনে
জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত এই ছাত্র সংগঠনটি নৃশংসভাবে ছাত্রনেতাদের হাতের
কবজি কেটে দেশজুড়ে আলোচনায় আসে।
নব্বইয়ের দশকের ছাত্রনেতাদের
বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, নৃশংসতা আর হত্যার মধ্য দিয়ে ১৯৯২ সালের পর থেকে জামায়াতে
ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ত্রাস হিসেবে পরিচিতি
পায়। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর মেধাবী নেতৃত্বকে একের পর এক হত্যার মাধ্যমে দুর্বল
করে ফেলা হয়। কিন্ত এসব ব্যাপারে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে।
এই সুযোগে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে ছাত্রশিবির।
১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি
ছ্ত্রামৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপম ‘সকাল-সন্ধ্যা’ নামের একটি বাসে করে ঢাকা
যাচ্ছিলেন। রাজশাহী মহানগরীর চৌদ্দপাই এলাকায় ছাত্রশিবির ক্যাডাররা বাসের পথরোধ করে।
একপর্যায়ে বাসভর্তি যাত্রীর সামনে সশস্ত্র শিবির ক্যাডাররা রূপমকে নিচে নামিয়ে আনে।
এরপর প্রকাশ্যেই তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা রূপমকে এ সময়
উপর্যুপরি ধারালো অস্ত্র দিয়েও আঘাত করা হয়। এসব কাজ পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করে খুব
ধীরে-সুস্থেই চলে যায় হামলাকারীরা। স্থানীয়রা তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
নেয়ার পথে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ঝরে যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো একটা মেধাবী প্রাণ।
১৯৯৬ সালের
৬ ফেব্রুয়ারি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - সংস্কৃতিকর্মী আমানউল্লাহ আমান হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্র সংস্কৃতিকর্মী আমান উল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে
কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রশিবিরের ক্যাডারেরা এবং অন্য একজন ছাত্রের হাত-পায়ের রগ কেটে
দেয়। এদের বাঁচাতে এসে দুইজন সহপাঠী ছাত্রী এবং একজন শিক্ষকও আহত হয়।
১৯৯৭ সাল:
চট্টগ্রাম পলিটেকনিক - ভিপি মোহাম্মদ জমির ও ফারুক হত্যাকাণ্ড
চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
দখল করার জন্য শিবির ক্যাডাররা ছাত্র সংসদের ভিপি মোহাম্মদ জমির ও ছাত্রনেতা ফরিদউদ্দিন
আহমদকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করার পরেও পায়ের রগ কেটে পুনরায় নিশ্চিত হয় ওরা মৃত।
১৯৯৭ সাল
৬ মার্চ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - প্রগতিশীল শিক্ষকদের বাসায় শিবিরের হামলা
বঙ্গবন্ধু পরিষদের রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি অধ্যাপক আবদুল খালেকসহ প্রায় কুড়িজন শিক্ষকের বাসায় বোমা
হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে ছাত্রশিবির ক্যাডারেরা। এই ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আতংক
ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৯৭ সালের
১৭ সেপ্টেম্বর: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - জিমনেসিয়াম ও পুলিশ ক্যাম্পে হামলা
গভীর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসে বহিরাগত শিবির সন্ত্রাসীদের হামলায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ
করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম পুলিশ ক্যাম্পেও বোমা হামলা করে শিবির ক্যাডারেরা।
১৯৯৭ সালের
অক্টোবর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় - শিবিরের নেপথ্য নেতৃত্বে কোটাবিরোধী আন্দোলন
শিবিরের প্রত্যক্ষ মদদে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন। ওই আন্দোলন ধ্বংসাত্মক
পরিস্থিতির দিকে যেতে থাকলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ডা. এস এ মালেকের
নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি বাহাদুর বেপারীর নেতৃত্বে কোনও
প্রকার সহিংসতা ছাড়াই ওই কোটাবিরোধী আন্দোলন দমন করা হয়। এর কিছুদিন পরে ছাত্রলীগের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সভাপতি মিহির কান্তি ঘোষাল এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ
নেতা প্রবীর গোস্বামী বাবুকে পিটিয়ে আহত করে ছাত্রশিবিরের সদস্যরা।
১৯৯৮ সালের
২৪ মে : সিলেট মহানগর - ছাত্রলীগ নেতা ডা. সৌমিত্র বিশ্বাস হত্যাকাণ্ড
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল
কলেজের ছাত্রলীগ নেতা ডা. সৌমিত্র বিশ্বাসকে নির্মমভাবে হত্যা করে ওই মেডিক্যাল কলেজের
ছাত্রশিবিরের সদস্যরা। শামসুদ্দিন ছাত্রবাসে ক্রিকেট খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের
সূত্রপাত হলে ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীরা নগরীর ব্লুবার্ড স্কুলের সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে
হত্যা করে ডা. সৌমিত্র বিশ্বাসকে। এই হত্যাকাণ্ডে ওসমানী মেডিক্যালের শিবির ক্যাডাররা
ছাড়াও পায়রা এলাকায় বসবাসকারী শিবির ক্যাডাররা জড়িত ছিলো। সাক্ষীর অবভাবে ডা. সৌমিত্র
হত্যার বিচার হয়নি।
১৯৯৮ সালের
২২ আগস্ট: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সঞ্জয় তলাপাত্র হত্যাকাণ্ড
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী সঞ্জয় তলাপাত্রকে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৮ এর আগস্টের
আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে উঠে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন। ফলে তিন দিন
ক্যাম্পাসে স্টেশনে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। ২০ আগস্ট সকালে বটতলী স্টেশনে মিছিলের
কোনও কর্মসূচি ছিলো না। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্তে ছাত্রশিবির কর্মীরা বড় লাঠি
ও রড দিয়ে হামলা করে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই আহত হয়। ঘটনার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে
বটতলী স্টেশনে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ক্যাম্পাসের ভেতরেও মিছিল সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত
হয়। সেদিনের বর্বর হামলায় স্টেশনের প্লাটফর্মে মৌলবাদী ঘাতক ছাত্রশিবিরের দ্বারা চারুকলার
২য় বর্ষের ছাত্র সঞ্জয় তলাপাত্র গুরুতর হত হন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সঞ্জয় খাতা আর
তুলির ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শাটল ট্রেনে করে যেতে চেয়েছিল তার প্রিয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু
স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রের লাঠি আর রডের আঘাত তাকে ক্যাম্পাসে পৌছাতে দেয়নি। গুরুতর আহত
অবস্থায় ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে। তারপর ৪৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ২২ আগস্ট সকাল
সাড়ে ৮টায় অত্যধিক রক্তক্ষরণে থেমে যায় একটি প্রাণবন্ত জীবন। ২২ আগস্ট ছিলো সঞ্জয় তলাপাত্রের
২২তম জন্মদিন।
১৯৯৮ সালের
৪ নভেম্বর : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - অধ্যাপক মো. ইউনূসের ওপরে সশস্ত্র হামলা
শিক্ষক সমিতির মিটিং থেকে
ফেরার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে অধ্যাপক মো. ইউনূসের ওপর সশস্ত্র
হামলা চালায় ছাত্রশিবিরের ক্যাডারেরা। ছাত্র-কর্মচারীদের প্রতিরোধে সেই যাত্রায় অধ্যাপক
ইউনূস প্রাণে বেঁচে গেলেও মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি।
১৯৯৯ সালের
ডিসেম্বর: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণকালে শিবিরের হামলা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে
অবস্থিত ১৯৭১-এর গণকবরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য স্থাপিত ভিত্তিপ্রস্তর রাতের আঁধারে
ছাত্রশিবির ভাঙতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী বাঁধা দেন। ফলে শিবির ক্যাডাররা
তাকে কুপিয়ে আহত করে এবং ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে ফেলে।
২০০০ সালের
১২ জুলাই: চট্টগ্রামের বদ্দারহাট - মাইক্রোবাসে গুলি চালিয়ে আট ছাত্রলীগ নেতা হত্যা
চট্টগ্রামের বদ্দারহাটে
চট্টগ্রাম শাহ আমানত সেতুর সংযোগ সড়কে দিনের বেলায় আড়াআড়ি বাস রেখে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীবাহী
মাইক্রোবাস আটকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় আটজনকে। চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার কালামিয়ার
বাজারে মহানগর ছাত্রলীগের এক সমাবেশে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন ছাত্রলীগের ওই নেতা-কর্মীরা।
পথে তারা হামলার মুখে পড়েন। গুলিবর্ষণে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। এরা হলেন, মো. হাসিবুর
রহমান হেলাল, রফিকুল ইসলাম সোহাগ, জাহাঙ্গীর হোসেন, আজিজুল ইসলাম বাবু, গাড়িচালক মনু।
পরে হাসপাতালে মারা যান আবুল কাশেম, জাহাঙ্গীর আলম ও জাহিদ হোসেন।
এ ঘটনায় নিহতদের একজনের
ভাই আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। ঘটনার আট বছর ২০০৮ সালের ২৭ মার্চ
এ মামলার রায় ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ একরামুল হক চৌধুরী।
রায়ে ছাত্রশিবিরের ক্যাডার সাজ্জাদ হোসেন খান, মো. আলমগীর কবির ওরফে বাট্টা আলমগীর,
মো. আজম ও মো. সোলায়মানকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এ ছাড়া আরও তিনজন ছাত্রশিবির ক্যাডার
হাবিব খান, এনামুল হক ও আবদুল কাইয়ুমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
করা হয়। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সবাই এখনো পলাতক। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের
মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন খান ভারতের কারাগারে, বাকি তিনজন দেশের কারাগারে বন্দী থাকলেও
২০২৪ সালের ৯ আগস্ট জেল থেকে বের হয় জামিন ছাড়াই। পুলিশ জানায়, সাজ্জাদ হোসেন ২০০৪
সালে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি ২০১২ সালের নভেম্বরে ভারতে গ্রেপ্তার হন।
২০০১ সালের
৩০ সেপ্টেম্বর : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে হত্যাচেষ্টা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
জনপ্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহাকে ছাত্রশিবির কর্মীরা হাত-পা বেঁধে জবাই করার
চেষ্টা করে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা টের পাবার ফলে, তাদের হস্তক্ষেপে তিনি
প্রাণে বেঁচে যান।
এই ঘটনার প্রতিবাদে দেশব্যাপী
নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষকবৃন্দ, সম্মিলিত
সাংস্কৃতিক জোট নেতৃবৃন্দ এবং ৭১’র ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির নেতৃবৃন্দ
এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই ঘটনা যেমন নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি তার চেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধের
চেতনাবাহী সমাজের ওপর হুমকি হিসাবে বিবেচনায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
টিএসসিতে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ হাসান ইমাম, অধ্যাপক এম আমিনুল
ইসলাম, অধ্যাপক আর আই এম আমিনুর রশীদ, আবদুল মান্নান চৌধুরী, ড. মোহাম্মদ সামাদ. মাওলানা
আবদুল আউয়াল, রামেন্দু মজুমদার, পান্না কায়সার, অহিদুজ্জামান চান, অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন
চৌধুরী, হাসান আরিফ প্রমুখ।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতারা
হচ্ছেন কবীর চৌধুরী, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমদ, কলিম শরাফী এ এম
হারুণ-অর রশীদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, সৈয়দ শামসুল হক, কাইয়ুম চৌধুরী,
রফিকুন নবী, সেলিনা হোসেন, হায়াৎ মামুদ, মফিদুল হক প্রমুখ। বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ
এক যুক্ত বিবৃতিতে এই ঘটনাকে একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে পাকবাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবীদের
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান,
অধ্যাপক মোশারফ হোসেন, ফজলে হাসান আবেদ, রাশেদা কে চৌধুরী, খুশী কবির, শামসুল হুদা
প্রমুখ। ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যবৃন্দের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক
এক যুক্ত বিবৃতিতে দোষীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি প্রদানের দাবি
জানিয়েছেন।
২০০১ সালের
১৬ নভেম্বর : জামালখান, চট্টগ্রাম - অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যাকাণ্ড
ভোর সাড়ে ছয়টা। চট্টগ্রাম
নগরের জামালখান রোডের শাওন ভবন। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ
গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী। তার বাসার গলির মুখে তিন চাকার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিলো দুর্ধর্ষ
শিবির ক্যাডার ছোট্ট সাইফুল। বাসার দরজায় অস্ত্র হাতে পাহারায় ছিলো তসলিম উদ্দিন মন্টু।
বাসায় ঢোকে দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার গিট্টু নাছির, আজম ও বাইট্টা আলমগীর। সিঁড়িতেই দেখা
হয় গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর স্ত্রী উমা মুহুরীর সঙ্গে। তার কাছে জানতে চায়, ‘আমাদের স্যার
কোথায়?’ শব্দ শুনে দরজা খুলে সোফায় এসে বসেন গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী। কে এসেছে জানতে চান।
তাৎক্ষণিক গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর মাথা লক্ষ্য করে একে ৫৬ রাইফেল থেকে পরপর দুইটি গুলি
করে গিট্টু নাসির। সেদিন এভাবেই গিট্টু নাছিরসহ শিবিরের দুর্ধর্ষ পাঁচ ক্যাডারের হাতে
বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, দক্ষ প্রশাসক, শিক্ষাবিদ ও জনপ্রিয়
শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী।
অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে নাজিরহাট
কলেজের হারানো গৌরব ফেরানো, দুর্নীতি বন্ধ ও মৌলবাদী রাজনীতির উৎখাতই কাল হলো তার জীবনে।
বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় খুন হন তিনি। ২০২০ সালের ৫
অক্টোবর এ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির সাজা সংশোধন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড
দিয়েছে আপিল বিভাগ। তারা হলো: তসলিম উদ্দিন মন্টু, আজম ও আলমগীর ওরফে বাইট্টা আলমগীর।
মামলার অন্য দুই আসামির মধ্যে গিট্টু নাছির ২০০৫ সালের ২ মার্চ হাটহাজারীতে র্যাবের
সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়, ছোট্ট সাইফুল ছাত্রশিবিরের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে গুলিতে
মারা যায়।
২০০৪ সালের
২৫ জুলাই : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রফ্রন্ট নেতা সুশান্ত সিনহা হত্যাচেষ্টা
শিবির ক্যাডার রবি ও রোকনের
নেতৃত্বে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল রাজশাহী ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক সুশান্ত
সিনহার ওপর হামলা চালায়। ইট দিয়ে জখম করার পামাপাশি তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা
চালায় শিবির ক্যাডাররা, এই ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রফ্রন্টের পাশে এসে দাঁড়ায় আজন্ম প্রগতিশীল
ছাত্রলীগ।
২০০৪ সালের
৩ আগস্ট : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রী হলগুলোতে ছাত্রীদের ওপর শিবিরের হামলা
পুনরায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্রী হলগুলোতে ছাত্রীসংস্থার বহিরাগতদের অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত ছাত্রী
বিক্ষোভে সশস্ত্র ছাত্রশিবির কর্মীরা হামলা চালায়। এতে পুরো ক্যাম্পাস উত্তাল হলে ওঠে,
বর্বোরচিত সেই হামলায় অগণিত ছাত্রী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
২০০৪ সালের
২৪ ডিসেম্বর : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - অধ্যাপক ড. মো. ইউনূস হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইউনূসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাবার সময় কুপিয়ে হত্যা
করা হয়। যদিও এই হত্যা মামলায় ছাত্রশিবির ও জেএমবির দুইজন সদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর পূর্বেও ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে দুই দফায় ছাত্রশিবির তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলো।
২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর
ভোরে বাসা থেকে হাঁটতে বের হওয়ার পরে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় দুর্বৃত্তদের
অতর্কিত হামলার শিকার হয়ে নির্মমভাবে মারা যান অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইউনুস।
হত্যাকাণ্ডের পর একই দিনে নিহত শিক্ষকের ছোট ভাই আবদুল হালিম বাদী হয়ে নগরের মতিহার
থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সিআইডি পুলিশ মামলার তদন্ত শেষে আট ছাত্রশিবির
ও জেএমবি সদস্যকে আসামি করে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে।
পরে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি
ছয়জনকে বেকসুর খালাস দিয়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।
আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে মৃত্যুদণ্ডের রায় স্থগিত করে পুনঃবিচারের আদেশ দেওয়া
হয়। পুনঃবিচারে ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন রাজশাহীর আদালত।
২০০৪ সালের
২৬ সেপ্টেম্বর : বাবুগঞ্জ, বরিশাল - ছাত্রমৈত্রী নেতা শামিম আহমেদ হত্যাকাণ্ড
বরিশালের বাবুগঞ্জের আগরপুর
ইউনিয়নের ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি শামীম আহমেদকে শিবির ক্যাডাররা কুপিয়ে ও হাত-পায়ের রগ
কেটে হত্যা করে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ড তখন দেশজুড়ে প্রতিবাদের জন্ম দেয়।
২০০৪ সালের
৩০ অক্টোবর: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রীদের সন্ত্রাসবিরোধী মিছিলে ছাত্রশিবিরের
হামলা
জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী
মহানগরের আমীর আতাউর রহমান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়তপন্থি প্রক্টর নূরুল
আফসারের উপস্থিতিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে ছাত্রশিবির
ক্যাডাররা প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্রীকে রক্তাক্ত করে।
২০০৬ সালের
২ ফেব্রুয়ারি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - অধ্যাপক আবু তাহের হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
জামাতপন্থী শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্রশিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীনসহ আরো দুইজন
শিবির ক্যাডার মিলে একযোগে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা
বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হত্যা করে। দুই দিন পর নিজ বাসভবনের পেছনে একটি সেপটিক
ট্যাংকের ভেতর তার লাশ পাওয়া যায়।
তাহের হত্যাকাণ্ডে জড়িত
থাকার দায়ে এক শিক্ষকসহ চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ
আদালতে আপিল করেন। পরে ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট।
এরা হলেন ড. তাহেরের সহকর্মী একই বিভাগের শিক্ষক ড. মিয়া মো. মহিউদ্দিন এবং ড. তাহেরের
বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
(রাবি) ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত
আসামিদের রিভিউ খারিজের রায় প্রকাশ করেছেন আদালত। ফলে একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড.
মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও কেয়ারটেকার মো. জাহাঙ্গীর আলমের ফাঁসি কার্যকরে আইনি বাধা
নেই। এ মামলায় ২০০৭ সালের ১৭ মার্চ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছিলো পুলিশ। বিচার
শেষে ২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার আদালত ৪ জনকে ফাঁসির আদেশ ও ২ জনকে খালাস
দেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন: একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন,
নিহত অধ্যাপক ড. তাহেরের বাসার কেয়ারটেকার মো. জাহাঙ্গীর আলম, জাহাঙ্গীর আলমের ভাই
নাজমুল আলম ও নাজমুল আলমের সম্বন্ধী আবদুস সালাম। খালাস পাওয়া চার্জশিটভুক্ত ২ আসামি
হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী ও আজিমুদ্দিন
মুন্সী।
২০০৮ সালে বিচারিক আদালতের
রায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি আসামিরা আপিল করেন। শুনানি
শেষে ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল অধ্যাপক ড. এস তাহের হত্যা মামলায় দুই আসামির ফাঁসির দণ্ডাদেশ
বহাল এবং অন্য দুই আসামির দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন হাইকোর্ট। ফাঁসির
দণ্ডাদেশ বহাল রাখা দুই আসামি হলেন অধ্যাপক ড. মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও কেয়ারটেকার
মো. জাহাঙ্গীর আলম। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন নাজমুল আলম ও আবদুস সালাম।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়,
“আসামিদের স্বীকারোক্তিগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, হত্যার এই ষড়যন্ত্রে মিয়া
মোহাম্মদ মহিউদ্দিনই মুখ্য এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন। আমাদের এটা বলতে দ্বিধা
নেই যে, ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক
ড. মহিউদ্দিন শুধু প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি পেতেই ড. তাহেরকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে
দেন। তার ধারণা ছিলো, ড. তাহের বেঁচে থাকলে অধ্যাপক হিসেবে তার পদোন্নতি পাওয়া সম্ভব
না। আমাদের এও বলতে দ্বিধা নেই যে, আপিলকারী জাহাঙ্গীর আলম এবং আবেদনকারী আবদুস সালাম
ও নাজমুল আর্থিক সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার জন্য অধ্যাপক তাহের আহমেদকে হত্যার
জন্য ড. মহিউদ্দিনের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন।”
২০০৬ সালের
২১ আগস্ট: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে হত্যাচেষ্টা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে
অনুষ্ঠিত ‘সেক্যুলারিজম ও শিক্ষা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার অপরাধে প্রখ্যাত
কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হককে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার ওপর হামলা
চালায় ছাত্রশিবির। প্রকাশ্য সমাবেশে তারা অধ্যাপক হাসান আজিজুল হকের গলা কেটে বঙ্গোপসাগরে
ভাসিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
২০১০ সালের
৮ ফেব্রুয়ারি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রলীগ নেতা ফারুক হত্যাকাণ্ড, লাশ ম্যানহোলে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে হত্যা করে ম্যানহোলের মধ্যে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা
হামলা চালায়। এ হামলায় ছাত্রলীগকর্মী ফারুক হোসেন নিহত হন। পরে তাকে ম্যানহোলে ফেলে
রাখা হয়। ঘটনার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাজেদুল ইসলাম
অপু বাদী হয়ে ৩৫ জন জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনকে
আসামি করে নগরীর মতিহার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার প্রায় আড়াই বছর পর
২০১২ সালের ২৮ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান আদালতে ১২৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র
দাখিল করেন। এতে জামায়াতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি
জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, রাজশাহী মহানগর
আমির আতাউর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি শামসুল আলম গোলাপ, সম্পাদক
মোবারক হোসেন, নবাব আব্দুল লতিফ হল শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি হাসমত আলী, শহীদ হবিবুর
রহমান হলের সভাপতি রাইজুল ইসলাম, শিবিরকর্মী রুহুল আমিন ও বাপ্পীসহ ১১০ জনকে অভিযুক্ত
করা হয়।
২০১৩ সালের
৯ এপ্রিল: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) - ছাত্রলীগ নেতা আরিফ রায়হান দ্বীপ
হত্যাকাণ্ড
জঙ্গি ছাত্রশিবির ও হিযবুত
তাহরিরের সশস্ত্র কর্মীদের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ায় বুয়েট ছাত্র আরিফ রায়হান দ্বীপের
ওপর হামলা চালানো হয়। বুয়েট ক্যাম্পাসে শিবিরকর্মীরা তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত
করে। তিন মাসের মাথায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার স্কয়ার হসপিটালে মারা যান দ্বীপ। দ্বীপকে
খুনের অপরাধে মেজবাহ নামের বুয়েটের এক ছাত্রকে গ্রেফতারের পর দ্বীপের ওপর হামলায় ছাত্রশিবিরের
জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসে। বড়ই দুঃখের বিষয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর পর দ্বীপের সকল
হত্যাকারী কারামুক্ত হয়। ছুরিকাঘাত করা হয়। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউরোসার্জন
পীযূষ কান্তি মিত্রের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং পরে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরিত
করা হয়। ২ জুলাই ভোর ৩:৩০ মিনিটে স্কয়ার হাসপাতালে দ্বীপ মারা যান।
দ্বীপের ভাই মামলা দায়ের
করলে পুলিশ ছাত্রশিবির নেতা মেজবাহউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। দ্বীপের উপর হামলায় জড়িতদের শাস্তির
দাবিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে।
তারা উপাচার্য এসএম নজরুল ইসলামের কাছে তাদের দাবি পেশ করে। বাংলাদেশ সরকার স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা বলার পর ২১ এপ্রিল তারা ক্লাস পুনরায় শুরু
করে।
ছাত্রশিবির নেতা মেজবাহউদ্দিন
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন, তাকে ডক্টর
এম এ রশিদ হল থেকে আটক করা হয়েছিলো এবং গোয়েন্দাদের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। তিনি
জঙ্গিনেতা মুফতি জসিমউদ্দিন রহমানীর সাথে যোগাযোগ করছিলেন। মেজবাউদ্দিনকে জামিনে মুক্তি
দেওয়া হয়েছিলো এবং বিচার আর এগোয়নি। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বীপের হত্যাকারী জঙ্গিনেতা মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীকে
জামিনে মুক্তি দেয়।
২০১৩ সালের
১৩ এপ্রিল : ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম - চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর ট্র্যাজেডি
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুরে
চট্টগ্রাম শহর থেকে দলীয় অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের
তিনশ’য়ের উপরে নেতাকর্মীর উপর আক্রমণ করে হাজারের উপরে ছাত্রশিবির ক্যাডারেরা, এই ঘটনায়
গুরুতর আহত হয় প্রায় সব নেতাকর্মী; মৃত্যুবরণ করেন তিনজন, পঙ্গুত্ববরণ করে এখনো বেঁচে
আছেন প্রায় ৬০জন নেতাকর্মী।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর
থানা এলাকায় আওয়ামী লীগের হরতালবিরোধী মিছিলে তাণ্ডব চালায় বিএনপি-জামায়াত ছাত্রশিবিরের
সন্ত্রাসীরা। এসময় তাদের হামলায় ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মী নিহত হয়। আহত হয় স্থানীয়
আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। সেদিন পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসেরসহ
অসংখ্য গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে তারা। পুলিশের ওপরও হামলা চালায় তারা। ‘ভূজপুর ট্র্যাজেডি’
হিসেবে এ ঘটনা সবার কাছে পরিচিত। ১১ এপ্রিল রাতে ভূজপুর থানায় নিহত তিনজনের পরিবার
তিনটি এবং পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস মিলে দুটিসহ মোট পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়। পাঁচ
মামলায় ৪৭১ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা।
মামলার এজাহারে বলা হয়,
২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল ভূজপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে হরতালবিরোধী
মিছিল শুরু হয়। এসময় স্থানীয় একটি মাদ্রাসার মসজিদ থেকে ডাকাত পড়ার ঘোষণা দিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে
এ হামলা চালানো হয়। তখন দেড় শতাধিক মোটরসাইকেল, পাঁচটি মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার,
তিনটি পিকআপ ও চারটি চাঁদের গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও পুড়িয়ে
দেওয়া হয়।
২০১৩ সালের
২২ আগস্ট : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তুহিনকে হত্যাচেষ্টা
শোক দিবসের আলোচনা শেষে
আমীর আলী হল থেকে মাদার বখশ্ হলে ফেরার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন
সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের
সদস্যরা। তুহিনের পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়, হাতের আঙুল কেটে নেওয়া হয়।
২০১৩ সালের ২২ অগাস্ট রাত
সাড়ে ৯টা। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক
তৌহিদ আল হোসেন তুহিন একটি অনুষ্ঠান শেষে সৈয়দ আমীর আলী হল থেকে মোটরসাইকেলে মাদার
বখস হলে ফিরছিলেন। সঙ্গে আরও পাঁচ-ছয় সহপাঠী ছিলেন। সৈয়দ আমীর আলী হলের পাশের রাস্তায়
প্রাধ্যক্ষ বাসভবনের সামনে পৌঁছালে ছাত্রশিবিরের তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক
(পরে সাংগঠনিক সম্পাদক) হাফিজের নেতৃত্বে আট থেকে ১০ জন মোটরসাইকেলে এসে তাদের লক্ষ্য
করে প্রথমে হাতবোমা নিক্ষেপ করে; পরে গুলি চালায়। তাদের ছোড়া গুলিতে বিদ্ধ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্রলীগের সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক শামসুজ্জামান সরকার শাওন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তুহিন
তাকে ধরতে গেলে প্রথম চাপাতি দিয়ে তার মাথায় কোপ দেওয়া হয়। পরপরই তার ডান হাত ও ডান
পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। সেদিনের হামলার কথা স্মরণ করে তুহিন বলছিলেন, “চাপাতি দিয়ে
কুপিয়ে ডান হাতের সব আঙুল কেটে ফেলে। তারা আমার তর্জনী আঙুল ছিড়ে নিয়ে চলে যায়। পরে
অন্য আঙুলগুলো অপারেশন করে জোড়া দেওয়া হলেও তর্জনী পাওয়া যায়নি।”
অনেক চিকিৎসার পর মৃত্যুর
দুয়ার থেকে ফিরে আসা তুহিন বলেছেন, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তার ক্যাম্পাসে অন্তত
১১ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। হত্যা করা হয় চার ছাত্রলীগ নেতাকে।
শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়; দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী
ইসলামী ছাত্রশিবিরের এমন নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছে।
আশি থেকে শুরু করে পরের
তিন দশক অবধি জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মত দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও
দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একচ্ছত্র ‘ভয়ের-রাজত্ব’ কয়েম করেছিলো জামায়াতে
ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে নানা সময়ে
বারবার ছাত্রশিবিরের নৃশংসতার শিকার হয়েছেন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, জাসদ ছাত্রলীগ,
ছাত্র সমাজ কেউ বাদ যায়নি। রক্ষা পাননি প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষকরাও।
২০১৪ সালের
২৯ এপ্রিল : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - ছাত্রলীগ নেতা টসর-মাসুদের ওপর হামলা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
জিয়া হলের সামনে, ছাত্রলীগ নেতা টগর ও মাসুদের উপর হামলা করে শিবির ক্যাডারেরা, কয়েক
মাস চিকিৎসা নিয়ে টগর সুস্থ্য হলেও, এক পা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে এখনো বেঁচে ছিলো
মাসুদ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে
প্রকাশ্যে নৃশংস ও বর্বর হামলায় ডান পা হারালেন ছাত্রলীগের নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদ
(২০)। তার বা পা-ও গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কেটে দেওয়া হয়েছে দুই হাতের রগ।
তার সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগের আরেক নেতা টগর মোহাম্মদ সালেহকে (২২) কুপিয়ে হাত-পায়ের রগ
কেটে দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
শহীদ জিয়াউর রহমান ও শহীদ হবিবুর রহমান হলের মাঝামাঝি স্থানে এ হামলা হয়। গুরুতর আহত
এ দুজনকে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্র, পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এবং অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকায় জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে
অস্ত্রোপচার শেষে তাঁদের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু
হাসপাতাল) নেওয়া হয়। আহত দুজন, ছাত্রলীগ ও পুলিশের অভিযোগ, ছাত্রশিবির এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১৫ জন ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীকে আটক করেছে পুলিশ। মাসুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। টগর ছাত্রলীগের
ছাত্রবৃত্তিবিষয়ক সম্পাদক ও ফোকলোর বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
আহত টগর ও প্রত্যক্ষদর্শীরা
জানান, সকাল আটটার দিকে মাসুদ ও টগর মাদার বখ্শ হল থেকে রিকশায় করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার
পথে জিয়াউর রহমান হল ও হবিবুর রহমান হলের মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছালে কয়েকজন যুবক তাঁদের
লক্ষ্য করে দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। তখন টগর ও মাসুদ রিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা
করলে হামলাকারীরা তাদের ধরে ফেলে এবং মাসুদকে টেনেহিঁচড়ে একটি দোকানের পেছনে নিয়ে যায়।
সেখানে তাকে উপর্যুপরি কুপিয়ে ডান পা গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বা পা প্রায় বিচ্ছিন্ন
করে ফেলা হয়। দুই হাতের রগও কেটে দেয়। টগরকে রাস্তার এক পাশে ফেলে হামলাকারীরা উপর্যুপরি
কুপিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আশপাশের লোকজন
তাঁদের উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। পরে তাদের ভর্তি করা
হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে তাঁদের ঢাকায় পাঠানো হয়।
২০১৬ সালের
২৩ এপ্রিল : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ড
ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে
সকালে রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকায় নিজের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে কুপিয়ে ও জবাই
করে হত্যা করা হয় ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে। পরের
বছরের ৬ নভেম্বর ছাত্রশিবিরের ৮ জনকে আসামি করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে
পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হলো আজ মঙ্গলবার। এতে দুইজনের ফাঁসি ও
তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০১৬ সালের নভেম্বরে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ছাত্রশিবির
ও জেএমবির আটজনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়। দোষী সাব্যস্ত পাঁচ জনের মধ্যে ছাত্রশিবির
নেতা শরীফুল ইসলাম এই মামলার প্রধান আসামী। চার্জশিটের তথ্য অনুযায়ী, শরিফুল নিজেই
হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। পুলিশের তথ্যানুযায়ী আটজনের মধ্যে তিনজন পুলিশের অভিযান ও
বন্দুক যুদ্ধে মারা যায়। ২০১৮ সালের মে মাসে আদালত সিদ্দিকী হত্যা মামলায় ২ জনকে মৃত্যুদণ্ড
ও ৩ জনকে যাবজ্জীবন দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীরা হলেন; রাবির ইংরেজি বিভাগের ছাত্র
ও ছাত্রশিবির নেতা শরিফুল ইসলাম ও রাজশাহী পলিটেকনিকের ছাত্র ও ছাত্রশিবির নেতা মাশকাওয়াত
হাসান সাকিব ওরফে আব্দুল্লাহ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জেএমবির রহমতউল্লাহ,
জেএমবির আব্দুস সাত্তার ও জেএমবির রিপন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শস্য বিজ্ঞান বিভাগের
ছাত্র ছিলেন। এরা প্রত্যেকেই ছাত্রশিবির এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন
বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য ছিলেন। মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামী শরীফুল রায় দেয়ার
সময় পর্যন্ত পলাতক ছিলেন।
অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী
১৯৫৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবুল
কাশেম প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ছিলেন। তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল
থেকে ১৯৬৯ সালে মাধ্যমিক এবং রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯৭২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।
এরপর ১৯৮০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি।
তিনি কর্মজীবন শুরু করেন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসাবে। দেড়
বছর সেখানে শিক্ষকতা করার পর যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক
হিসাবে। একই বিভাগে তিনি ২০০১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন
করেন।
২০২৪ সালের
জুলাই : নিখুঁত পরিকল্পনার ষড়যন্ত্র - মুখোশের আড়ালে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে ছাত্রশিবির
কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে
ছাত্রশিবিরের সদস্যরা মুখোশের আড়ালে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। পুরো জুলাইজুড়ে ডক্টর ইউনূসের
ম্যাটিক্যুলাস ডিজানাইনের অংশ হিসাবে স্নাইপার দিয়ে হত্যা করতে থাকে সাধারণ শিক্ষার্থী,
পথচারী, নারী ও শিশুদের। নিখুঁত এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে ১৬ জুলাই হত্যা করা হয় রংপুরের
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবু সাঈদকে, দলীয় সিদ্ধান্তের
অংশ হিসাবে পুলিশের পিটুনিতে আহত আবু সাঈদকে ৫ ঘন্টা আটকে রেখে নির্যাতন করে মৃত্যু
নিশ্চিত করে ছাত্রশিবিরের রংপুর বিভাগের কিলিং স্কোয়াড।
একইভাবে ঢাকায় হত্যা করা
হয় মীর মুগ্ধ সহ অসংখ্য ছাত্রকে। স্নাইপার দিয়ে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটায় ছাত্রশিবিরের কিলিং
স্কোয়াড। ফ্ল্যাট বাসার বারান্দায় থাকা শিশুও রক্ষা পায়নি ওদের হাত থেকে। শেখ হাসিনার
সরকারকে উৎখাতের জন্য লাশের পর লাশের সারি দিয়ে ক্ষমতার সেঁতু তৈরি করে ছাত্রশিবির।
২০২৪ সালের
৩-৪ আগস্ট : পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র - নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ হিসাবে পুলিশ হত্যাযজ্ঞ
অগণিত লাশের পর ছাত্রশিবিরের
টার্গেটে পরিণত হয় পুলিশ বাহিনী, একের পর থানায় হামলা চালিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা
হয় অগণিত পুলিশ সদস্যকে। বর্বরোচিতভাবে পুলিশদের হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয় ফ্লাইওভারের
সাথে, ঝুলিয়ে রাখা হয় গাছের সাথে। ঢাকা শহরে দায়িত্বপালনরত পুলিশদেরও হত্যা করা নির্মমভাবে।
এসব হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের
সমন্বয়কারীরা। সারাদেশ মিলিয়ে শহস্রাধিক পুলিশকে হত্যা করা হয়।
২০২৪
সালের ৫ আগস্ট : ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর - জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে
দেয়
নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ
হিসাবে সারাদেশে ধ্বংস করা হয় মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা, ভাস্কর্য ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য।
বাঙালির আত্মপরিচয়ের ঠিকানা ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িও লুটপাট করে পুড়িয়ে
দেওয়া হয়। ভয়ংকর লেলিহান শিখার মতো জ্বলতে থাকে বাড়ি, এই বাড়ির সাথে জ¦লতে বাঙালি জাতির
আত্মপরিচয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পোড়ানোর মিশনে অংশ নেয় ছাত্রশিবিরের সর্বস্তরের নেতাকর্মী।
ডক্টও ইউনূস ও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নির্দেশে এই ভয়ংকর ট্র্যাজেডি তৈরি
করে ছাত্রশিবির। আর এর নেপথ্যে সহযোগিতা করে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী।
২০২৪
সালের ৭ সেপ্টেম্বর : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় - পা হারানো পঙ্গু সাবেক ছাত্রলীগ নেতা
মাসুদ হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতা দুই পা হারানো আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করেছে ছাত্রশিবির
নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন
আম্মারের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের সদস্যরা। ৭ সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে তার ওপর হামলা হয়। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় থানায় সোপর্দ
করা হলে সেখানে আরেক দফা পেটানো হয় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সামনেই। এরপর হাসপাতালে নেওয়া
হলে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি মারা যান। রাতে বিনোদপুর বাজারে মাসুদের ওপর হামলা হয়।
পরে একদল ছাত্রশিবিরের সদস্যরা তাকে প্রথমে মতিহার থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু মতিহার থানায়
৫ আগস্টের সহিংসতার কোনো মামলা নেই। তাই তাঁকে বোয়ালিয়া থানায় আনা হয়, যেন তাকে কোনো
সহিংসতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এর আগে আবদুল্লাহ আল মাসুদ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য।
তিনি নগরের বুধপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল সকালে ক্লাসে যাওয়ার পথে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের সামনেও শিবিরের সদস্যদের হাতে হামলার শিকার হন আবদুল্লাহ
আল মাসুদ। ওই সময় মাসুদের ডান পায়ের নিচের অংশ গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। বাঁ পা
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেটে দেওয়া হয়েছিল তার হাতের রগ।
২০২৪ সালের
১৮ সেপ্টেম্বর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় - মানসিক ভারসাম্যহীন এতিম তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড
মানসিক ভারসাম্যহীন মা-বাবাহীন
এতিম তরুণ তোফাজ্জল হোসেনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্রশিবিরের
সদস্যরা বর্বরোচিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালীন সময়ে মোবাইল চুরির
মিথ্যা নাটক সাজিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের শিবিরের সদস্যরা তোফাজ্জল
হোসেনকে পার্শ্ববর্তী রাস্তা থেকে আটক করে ফজলুল হক মুসলিম হলে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে
তাকে বর্বোরচিতভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। হলের ২১জন ছাত্র শিবির নেতা ও সদস্যসহ
আরও কিছু সদস্য ক্রিকেট ব্যাট ও স্টাম্প ব্যবহার করে তাকে নির্মমভাবে প্রহার করে কিছুক্ষণ
পর, তোফাজ্জল হোসেনকে হলের ক্যান্টিন থেকে খাবার খাওয়ানো হয়, কিন্তু তার খাওয়া শেষ
হওয়ার পরপরই হলের এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ের গেস্টরুমে পুনরায় পিটানো হতে হতে থাকে।
একই সঙ্গে শিবিরের সদস্যরা
তোফাজ্জল হোসেনের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দাবি করে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তারা চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে যতক্ষণ
না তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যু নিশ্চিত হয় ততক্ষণ তারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। মৃত্যু নিশ্চিত
করে তোফাজ্জল হোসেনকে প্রক্টরদের কাছে হস্তান্তর করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য
জামায়াত নেতা নিয়াজ আহমেদের উপস্থিতিতে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো এই তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডের
পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জঙ্গিপন্থি উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান।
তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডের
ঘটনায় ২১জন ছাত্রশিবিরের সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করে পুলিশ। পুলিশের
অভিযোগপত্রে উল্লেখিত আসামিরা হলো: ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির নেতা এবং পদার্থবিজ্ঞান
বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জালাল মিয়া, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির নেতা এবং মৃত্তিকা
পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন মিয়া, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির নেতা
এবং পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা
ছাত্রশিবির সদস্য এবং ভূগোল বিভাগের আল হোসেন সাজ্জাদ, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির
সদস্য ও আবাসিক শিক্ষার্থী আহসান উল্লাহ, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য
ওয়াজিবুল আলম, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য ফিরোজ কবির, ফজলুল হক মুসলিম
হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য আব্দুস সামাদ, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য
শাকিব রায়হান, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য ইয়াসিন আলী, ফজলুল হক মুসলিম
হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য ইয়ামুজ্জামান ইয়াম, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য
ফজলে রাব্বি, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য শাহরিয়ার কবির শোভন, ফজলুল
হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য মেহেদী হাসান ইমরান, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির
সদস্য রাতুল হাসান, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য সুলতান মিয়া, ফজলুল হক
মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য নাসির উদ্দিন, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির
সদস্য মোবাশ্বের বিল্লাহ, ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য শিশির আহমেদ, ফজলুল
হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির সদস্য মহসিন উদ্দিন ও ফজলুল হক মুসলিম হল শাখা ছাত্রশিবির
সদস্য আব্দুল্লাহিল ক্বাফি।
শেষের কথা
ইতিহাসের পাতা থেকে ছাত্রশিবির কর্তৃক হত্যাযজ্ঞের মাত্র সামান্য কিছু উল্লেখযোগ্য ক্ষতিয়ান প্রকাশ করলাম, এছাড়াও অসংখ্য ঘটনা এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে; সামনে হয়তো আরো আছে, কে জানে কখন কে ছাত্রশিবিরের বর্বরতার শিকার হয়! তাছাড়া আরিফ আজাদ নামক ছাত্রশিবিরের এক জঙ্গি সদস্য ‘প্যারাডোক্সিক্যাল সাজিদ’ নামে একটি বই লিখে তা কৌশলে কিশোরদের মধ্যে বিলি করে জঙ্গি তৈরির নতুন মিশনে নেমেছে। আপনি আমি কিংবা মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন কেউ ওদের হাতে নিরাপদ নই; তাই আসুন সময় থাকতে আমরা সতর্ক হই। প্রতিরোধ গড়ে তুলে মৌলবাদী অপশক্তিকে নির্মূল করি ত্রিশ লক্ষ্য শহীদের রক্তস্নাত এই বাংলাদেশ থেকে; এই মাটির মান আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, মৌলবাদী জঙ্গিদের লালনকারী গণহত্যাকারী ডক্টর ইউনূসকে অপসারণের জন্য জেগে উঠতে হবে, তবেই আমাদের মুক্তি মিলবে। আসুন সমস্বরে বলে উঠি ‘মা ভৈ...!’