পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী
বাঙালিদের ওপর যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তা শুধু এই উপমহাদেশেই নয়, বরং পুরো বিশ্ব
বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। যে যেখানে সুযোগ পেয়েছেন তিনি সেখান থেকেই তার সাধ্যের সবটুকু
ঢেলে দিয়ে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম আর তার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিঃশর্ত
মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।
বিশেষ করে যারা কোনো দিন
বাংলাদেশকে চিনতেন না সেসব বিদেশি অনেক বন্ধু আমাদের মুক্তি সংগ্রামে অনন্য ভূমিকা
রেখেছেন। কেউ কেউ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হানাদার বাহিনীর
বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন। কেউ কেউ পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে বিশ্ব
বিবেককে আহ্বান জানিয়ে নানা কর্মসূচী পালন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র আর যুদ্ধের
রসদ যোগাতে অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১। প্যারিসের
অর্লি বিমানবন্দর। ঘড়িতে সকাল সাড়ে এগারোটা। লন্ডন থেকে উড়ে আসা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল
এয়ারলাইনসের ‘সিটি অব কুমিল্লা’ বোয়িং-৭২০ বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পাঁচজন যাত্রী নিয়ে
বিমানটি রোম ও কায়রো হয়ে করাচি যাবে। যাত্রীদের সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যূহ
পেরিয়ে বিমানে চড়ে বসেন ২৮ বছর বয়সী জ্যঁ ক্যুয়ে।
বেলা ১১:৫০। পাইলট ওড়ার
জন্য বিমানটি চালু করতেই পকেট থেকে পিস্তল বের করে জ্যঁ ককপিটে গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ
করার নির্দেশ দেন। নইলে সঙ্গে থাকা বোমা দিয়ে পুরো বিমানবন্দর উড়িয়ে দিবেন। পাইলটের
ওয়্যারলেস থেকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে বিমানে ২০ টন ঔষধ ও চিকিতসা সামগ্রী তুলে দেওয়ার
নির্দেশ দেন। এগুলো পাঠাতে হবে ভারতে শরণার্থীশিবিরে; যুদ্ধাহত ও বাংলাদেশি শরণার্থীদের
সহায়তায়। কোনো আপস চলবে না। পাঁচ ঘণ্টা ধরে কর্তৃপক্ষ নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও
জ্যঁ-র সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নাড়াতে পারেনি।
বিমান ছিনতাইয়ের এই ঘটনা
মুহূর্তে ফ্রান্স ছাপিয়ে ইউরোপ হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সসহ বিশ্বের প্রভাবশালী
টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিছুক্ষণ পরপর ঘটনার হালনাগাদ দিতে থাকল। বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধবিরোধী
ও মানবতার পক্ষের আন্দোলনকারীদের কাছে জ্যঁ নামের ওই বাবরি দোলানো যুবক ততক্ষণে রীতিমতো
হিরো।
বিমানটিকে মুক্ত করতে ফরাসি
সরকার এক ফাঁদ আটল। রেডক্রস ও ‘অর্ডি দ্য মানতে’ নামক আরেক ফরাসি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার
সহায়তায় বিকাল পাঁচটার দিকে বিমানবন্দরে দু’টি ওষুধভর্তি গাড়িতে আনা হয় এক টন ঔষধ।
গাড়ির চালক ও স্বেচ্ছাসেবকের বেশে বিমানে প্রবেশ করে পুলিশের বিশেষ শাখার চারজন সদস্য।
পুলিশ সদস্যরা ওষুধের বাক্স নামানোতে সহায়তার নাম করে জ্যঁর হাতে একটি বাক্স তুলে দিয়েই
তাঁকে আক্রমণ করে বসে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রাত আটটায় জ্যঁ পুলিশের হাতে আটক হন।
গ্রেপ্তারের পর অবশ্য পুলিশ জ্যঁ ক্যুয়ের কাছে কোন বোমা খুঁজে পায়নি। বোমার পুরো
বিষয়টি ছিল ধাপ্পাবাজি। বোমা সদৃশ যে বাক্সটি তাঁর হাতে ছিল তাতে কেবল কিছু বৈদ্যুতিক
তার, বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক শেভার পাওয়া যায়।
ফরাসি সরকার অবশ্য প্রতিশ্রুতি
রেখেছিল। ডিসেম্বরের ৮ তারিখে জ্যঁ ক্যুয়ে জেলে থাকা অবস্থাতেই ফরাসি রেডক্রস ও নাইটস
হাসপাতাল বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য ২০ টন ওষুধ ও শিশু খাদ্য পাঠায়। সরকার নীতিগতভাবে
সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশকে সাহায্য করার। জাতিসংঘের পাকিস্তানে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেও
বন্ধুরাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন না করে ভোটদানে বিরত থাকে ফ্রান্স।
আদালত জ্যঁ ক্যুয়েকে পাঁচ
বছরের কারাদণ্ড দেয়। কারাগারে থাকা অবস্থাতে জ্যঁ-র পক্ষে ফ্রান্স ও বিশ্বের বিভিন্ন
দেশের মানবাধিকারকর্মী সোচ্চার হয়ে ওঠেন। অনেক আইনি লড়াইয়ের পর আদালত জ্যঁ ক্যুয়ের
শাস্তির মেয়াদ তিন বছর কমিয়ে ১৯৭৩ সালে মুক্তি দেয়।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের তেপ্পান্ন বছর পরেও আজ আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমাদের বিদেশি বন্ধু জ্যঁ ক্যুয়েকে। তার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
তাওহিদা রহমান
নূভ : কবি, কথাসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।